ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কথা আপাতত ভুলে যান। কারণ, এবারের প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে আর্সেনালের শিরোপা ধরে রাখার পথে সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হতে চলেছে ইতিহাস নিজেই। গত মৌসুমের গৌরবময় জয়ের পর, এখন গানারদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।
প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা ধরে রাখার মানসিক চাপ
ফুটবল ভক্তরা, বিশেষ করে যারা নিয়মিত ইংলিশ ফুটবল লাইভ অনুসরণ করেন, তারা হয়তো ভাবতে পারেন যে আর্সেনালের জন্য এবারের পথচলা সহজ হবে। কারণ অন্যান্য অনেক দলই তাদের নতুন কোচদের সাথে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন।
যখন কোনো দলের জার্সির হাতায় চ্যাম্পিয়নদের সোনালী ব্যাজ যুক্ত হয়, তখন পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। প্রতিটি প্রতিপক্ষ দলই চায় লিগ চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে নিজেদের প্রমাণ করতে। আর্সেনাল খুব দ্রুতই এই রূঢ় বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে। ২০১৬ সালে লেস্টার সিটির হয়ে শিরোপা জেতা প্রাক্তন ডিফেন্ডার ড্যানি সিম্পসন একবার বলেছিলেন যে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই হাল সিটির কাছে হেরে যাওয়াটা তাদের জন্য একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছিল। তারা হারের তিক্ততা ভুলেই গিয়েছিল, এবং সেই ধাক্কা সামলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
কিংবদন্তি কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে থাকাকালীন সবসময় সতর্ক করতেন যে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঠিক পরের মৌসুমটিই সবচেয়ে কঠিন হয়। তার সেই কথা আজও প্রতিটি দলের জন্য ধ্রুব সত্য।

আর্সেনাল ও ইতিহাসের অভিশাপ: একটি গভীর বিশ্লেষণ
ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে আর্সেনাল ১৪ বার শীর্ষস্থান দখল করেছে, যা তাদের লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের (২০ বার) ঠিক পেছনেই জায়গা করে দিয়েছে। কিন্তু ১৯৩৪/৩৫ মৌসুমের পর থেকে তারা কখনোই সফলভাবে নিজেদের লিগ শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি। গত মৌসুমের ঐতিহাসিক জয়ের আগে, ১৯৩৫ সাল থেকে তারা ৯ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরের মৌসুমে সেই মুকুট ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ২০০৩/০৪ মৌসুমে আর্সেন ওয়েঙ্গারের সেই বিখ্যাত “ইনভিন্সিবল” বা অপরাজিত দলটিও পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।
শিরোপা ধরে রাখা মানে হলো এই ঐতিহাসিক অভিশাপকে ভেঙে ফেলা। কিন্তু আর্সেনালের বর্তমান কোচ মিকেল আর্তেতা এই চ্যালেঞ্জ নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি তার খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন:
“আমরা আবারও চূড়ায় পৌঁছাতে চাই। সেই গৌরবময় মুহূর্তগুলো আবার বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে রয়েছে। আমরা জানি এই কাজটা কতটা কঠিন, কারণ এই ক্লাবের ইতিহাসে এমনটা খুব কমই ঘটেছে। এর জন্য অসাধারণ কিছুর প্রয়োজন, এবং আমরা প্রস্তুত। যদি আমরা আমাদের মান ধরে রাখতে পারি, তবে আর্সেনাল এবারও অত্যন্ত ভয়ংকর একটি দলে পরিণত হবে।”
আজকের আর্সেনাল খবর: আর্তেতার জয়ের মন্ত্র
আজকের আর্সেনাল খবর যারা নিয়মিত রাখেন, তারা জানেন যে আর্তেতা শুধুমাত্র একজন কৌশলগত জিনিয়াসই নন, তিনি একজন অসাধারণ মোটিভেটরও। তার কৌশলগত দক্ষতা এবং দলের মানসিকতা পরিচালনার ক্ষমতা আর্সেনালকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কোভেন্ট্রি সিটির বিপক্ষে লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় তারই প্রমাণ।
অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়া (যারা টানা দুটি জয় পেয়েছে), বাকি সব শীর্ষ দলগুলোই নিজেদের প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লিভারপুল নিউক্যাসলের সাথে ড্র করেছে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহ্যাম যথাক্রমে হাল সিটি এবং ব্রেন্টফোর্ডের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরেছে। চেলসি ফুলহ্যামের বিপক্ষে কোনোমতে জয় পেয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে আর্সেনাল এখনও বাকিদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।
প্রিমিয়ার লিগ পয়েন্ট টেবিল: বিগ সিক্সের বর্তমান অবস্থা
১৯৯২/৯৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ শুরু হওয়ার পর থেকে মাত্র তিনজন কোচ তাদের দলের শিরোপা ধরে রাখতে পেরেছেন: স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, হোসে মরিনহো এবং পেপ গার্দিওলা। ১৯৬০ সাল থেকে হিসাব করলে লিভারপুলও এই তালিকায় যুক্ত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চ্যাম্পিয়নদের জন্য নিজেদের মুকুট ধরে রাখা এত কঠিন কেন?
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে পাঁচবার শিরোপা জেতা ওয়েস ব্রাউন এর একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তার মতে, চ্যাম্পিয়ন হিসেবে লিগে ফিরে আসাটা মানসিকভাবে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। প্রতিপক্ষ সবসময় সেরা দলকে হারাতে মুখিয়ে থাকে। কিন্তু আসল সমস্যাটা লুকিয়ে থাকে খেলোয়াড়দের নিজেদের মনের গভীরে। সাফল্যের পর আত্মতুষ্টি চলে আসাটা খুব স্বাভাবিক। আর এই আত্মতুষ্টিই পতনের মূল কারণ।
এই জায়গাতেই একজন বিশ্বমানের কোচের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। স্যার অ্যালেক্স কখনোই তার দলকে সাফল্যের ওপর ঘুমিয়ে থাকতে দিতেন না। আর্তেতাও ঠিক একই দর্শন অনুসরণ করছেন। তিনি নিজেই এই দলটিকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, তাই দলের নাড়ি-নক্ষত্র তার ভালোভাবেই জানা।

মিকেল আর্তেতার কৌশল বনাম কিংবদন্তিদের ইতিহাস
১৯৯৩ সালে যখন স্যার অ্যালেক্স ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ২৬ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়েছিলেন, তখন তিনি বিশ্বাস করতেন যে আত্মতুষ্টিই তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। নতুন মৌসুমের প্রথম অনুশীলনে তিনি পুরো দলের সামনে একটি খাম উঁচিয়ে ধরে বলেছিলেন যে, এতে এমন তিনজন খেলোয়াড়ের নাম লেখা আছে যারা আগামী মৌসুমে দলকে হতাশ করবে। পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে খামে কোনো নাম ছিল না, এটি ছিল মূলত খেলোয়াড়দের জেদ এবং আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে তোলার একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
আর্তেতাও এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে বেশ পারদর্শী। মিকেল আর্তেতার কৌশল শুধুমাত্র মাঠের ট্যাকটিক্সেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দলের মধ্যে বিজয়ী মানসিকতা ধরে রাখতে ট্রেনিং গ্রাউন্ডে “উইন” নামের একটি কুকুরও নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এবার শিরোপা ধরে রাখার চাপ তার নিজের ওপরেও অনেক বেশি।
তাকে এখন ফার্গুসন, মরিনহো এবং গার্দিওলার মতো সর্বকালের সেরা কোচদের কাতারে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আর্সেন ওয়েঙ্গার তিনটি শিরোপা জিতলেও কখনোই তা ধরে রাখতে পারেননি। কার্লো আনচেলত্তি বা ইয়ুর্গেন ক্লপও এই কীর্তি গড়তে পারেননি।
নতুন চ্যালেঞ্জ এবং আর্সেনালের ভবিষ্যৎ
প্রাক্তন লিভারপুল তারকা স্টিভ নিকোলের মতে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দলে চোট-আঘাত, মূল খেলোয়াড়দের ফর্মহীনতা বা নতুন খেলোয়াড়দের মানিয়ে নিতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে আর্সেনালের বর্তমান স্কোয়াড লিগের সবচেয়ে শক্তিশালী। ব্রুনো গুইমারেস-এর মতো বিশ্বমানের রিক্রুটমেন্ট তাদের মিডফিল্ডকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
কোভেন্ট্রি সিটির বিপক্ষে এমিরেটসে উদ্বোধনী ম্যাচের আগে আর্সেনাল পরিষ্কার ফেভারিট ছিল। ডিসেম্বরে আর্সেনালের কোচ হিসেবে আর্তেতার সাত বছর পূর্ণ হবে। এই দীর্ঘ সময়ের স্থিতিশীলতা তাদের জন্য একটি বিশাল সুবিধা। “বিগ সিক্স” এর অন্য দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, মাইকেল ক্যারিক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র জানুয়ারিতে। চেলসিতে জাবি আলোনসো, লিভারপুলে আন্ডোনি ইরাওলা, সিটিতে এনজো মারেসকা এবং টটেনহ্যামে রবার্তো ডি জার্বি—সবাই নতুন করে দল গুছিয়ে নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, উনাই এমেরির অ্যাস্টন ভিলা স্থিতিশীল থাকলেও গ্রীষ্মকালীন দলবদলে তারা মরগান রজার্স, ইউরি তিলেমান্স, লুকাস ডিগনে এবং এজরি কোনসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের হারিয়েছে। ব্রাইটনের বিপক্ষে ০-৪ গোলের হার তাদের ভেতরের সংকটকে প্রকট করে তুলেছে।
BD788 এর মতো নির্ভরযোগ্য স্পোর্টস প্ল্যাটফর্মগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০৪ সালে আর্সেনাল যখন শেষবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মাঠে নেমেছিল, তখনকার পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তখন রোমান আব্রামোভিচের বিপুল অর্থ এবং হোসে মরিনহোর আগমনে চেলসি একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে আর্সেনালের সামনে তেমন কোনো একক শক্তিশালী হুমকি নেই।
ফুটবলের নিয়মে কিছু পরিবর্তন (যেমন সময় নষ্ট করা বা পেনাল্টি বক্সের ফাউল সংক্রান্ত) আর্তেতাকে হয়তো কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে, কিন্তু তা গানারদের থামানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
আর্সেনালকে এখন শুধু নিজেদের আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে লড়তে হবে। দলের স্কোয়াড ডেপথ চমৎকার এবং তারা ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় খেলার চাপের সাথেও অভ্যস্ত। ইতিহাস হয়তো আর্তেতা এবং আর্সেনালের বিরুদ্ধে, কিন্তু গত মৌসুমে তারা যেমন সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, এবারও হয়তো নতুন কোনো ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় রয়েছে এমিরেটস স্টেডিয়াম।

